পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে মৌসুমি অপরাধী চক্র। বাড়ি ফেরা যাত্রী, পশুর হাট ও ব্যস্ত গণপরিবহণকে লক্ষ্য করে মাঠে নেমেছে অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাইকারী, জাল নোট চক্র ও চাঁদাবাজরা। ইতোমধ্যে এসব চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেক মানুষ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দুই হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপদে ঈদ উদযাপনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন থাকতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি ও প্রতারক চক্র সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব মৌসুমি অপরাধী মূলত সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও ঢাকার আশপাশের জেলা থেকে ঈদ কিংবা উৎসবের আগে রাজধানীতে আসে। বছরের অন্য সময় তারা ছোটখাটো কাজ করলেও উৎসবের মৌসুমে বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও গণপরিবহণে যাত্রী সেজে প্রতারণা ও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মৌসুমি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রী ও নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে।
অনলাইন-অফলাইনে সক্রিয় জাল নোট চক্র:
ঈদ সামনে রেখে জাল নোট চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সারা বছর তৈরি করা জাল নোটের বড় অংশই দুই ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারে ছাড়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপেও প্রকাশ্যে জাল নোট কেনাবেচার পোস্ট দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এক লাখ টাকার জাল নোট ছয় হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর দাম ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকাও চাওয়া হচ্ছে।

গত ১৩ মে রাতে মতিঝিলের কমলাপুর বাজার রোডের একটি সাইবার ক্যাফে থেকে জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ দুজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-৩। পরদিন উত্তরা ও টঙ্গী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে জাল নোট তৈরির কারখানা চালু রয়েছে। এসব চক্র ঈদকে সামনে রেখে পশুর হাট ও মার্কেটগুলোতে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বাড়ছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা:
ঈদ সামনে রেখে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতাও বেড়েছে। গরুর হাট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও গণপরিবহণে যাত্রীদের লক্ষ্য করে সক্রিয় রয়েছে এসব চক্র।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনজন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন।
সম্প্রতি উত্তরা এলাকায় অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, বাসে সহযাত্রী পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে চেতনানাশক খাইয়ে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। একইভাবে কামরাঙ্গীরচরের এক অটোরিকশাচালকের অটোরিকশাও নিয়ে গেছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা।
প্রকাশ্যে ছিনতাই:
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে। আগে গভীর রাত ও ভোরে বেশি ছিনতাই হলেও এখন দিনদুপুরেও প্রকাশ্যে ছিনতাই হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১১ মে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় চলন্ত রিকশা থামিয়ে এক কলেজছাত্রের গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে আগারগাঁওয়ে চিকিৎসার টাকা নিয়ে যাওয়ার পথে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
র্যাবের সতর্কতা ও নজরদারি:
র্যাব জানিয়েছে, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি পশুর হাটে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। টহল ও নজরদারির পাশাপাশি জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিনও রাখা হবে।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধেও অনলাইনে নজরদারি চালানো হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাব সদস্যরা মাঠে সক্রিয় থাকবেন।
Leave a Reply